
বৈশ্বিক বিনিয়োগের মানচিত্রে থাইল্যান্ডের ক্রমাগত উত্থান ও সাফল্য এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে ৩ হাজার ৩৭০টি প্রকল্পের আবেদন জমা পড়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ২৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬৭ শতাংশ বেশি। এমন বিনিয়োগ প্রবাহ দেশটিকে এশীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করছে। তবে এসব পরিসংখ্যান বিনিয়োগের আবেদন ও প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ নির্দেশ করে, বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া বিনিয়োগের পরিমাণ নয়।
বিনিয়োগের এই উল্লম্ফন কেবল সংখ্যায় নয়, বরং খাতওয়ারি বৈচিত্র্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বিনিয়োগ উন্নয়ন সুবিধা পাওয়ার আশায় যে আবেদনগুলো জমা পড়েছে, তার মোট মূল্য ১ লাখ ৬ হাজার কোটি বাথ। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৯ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারে থাইল্যান্ডের গুরুত্ব বাড়ছে, যেখানে শুধু ডিজিটাল খাতেই ৫২ হাজার ২৬০ কোটি বাথের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নির্মাণ, যেখানে ২৮টি আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে ৫২ হাজার ১২০ কোটি বাথ বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশটির অন্যতম কৌশল হলো সব শিল্পকে সমান সুবিধা না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
থাইল্যান্ডের এই সাফল্যের বিপরীতে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা উভয়ই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, থাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালাল খাদ্য উৎপাদনের মতো প্রতিশ্রুতিশীল খাতগুলোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। থাই বিনিয়োগকারীরাও এসব খাতে বেশ আগ্রহী বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে চট্টগ্রাম ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোর মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ টানতে দেশটি পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ শিল্পায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইছে। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার মধ্যে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের মতো সাফল্য পেতে হলে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পণ্য খালাসের জটিলতা কমিয়ে দ্রুতগতির সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে প্রধান পরিবহনপথ ও বন্দরের সরাসরি উন্নত সংযোগ স্থাপনের বিকল্প নেই।
তবে অবকাঠামোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন সবচেয়ে জরুরি। এজন্য বিনিয়োগ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নির্ধারিত সময়েই গ্রহণ করতে হবে। যদি কোনো কাজে দেরি হয়, তবে তার যৌক্তিক কারণ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের উত্থাপিত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং যেকোনো বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিরসনের জন্য একটি কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এগুলো দেখায়, ভবিষ্যৎ শিল্পের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড সক্রিয় রয়েছে।
